শনিবার ১৩ জুন ২০২৬
Online Edition

বিঘ্নিত হচ্ছে জনসেবা

অ্যাডভোকেট তোফাজ্জল বিন আমীন

জনসেবায় স্থানীয় সরকারের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রের শাসনকার্য সুন্দরভাবে পরিচালনার ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা অগ্রণী ভূমিকা রাখে। আর স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা গড়ে ওঠার মূল কারণ ছিল তৃণমূল পর্যায়ের জনগণের সমস্যার সমাধান ও গ্রামীণ উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করা। স্থানীয় সরকারের প্রশাসনিক স্তরগুলো হচ্ছে, সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদ। এসব প্রতিষ্ঠান জন্মনিবন্ধন, মৃত্যু সনদ, নাগরিক সনদ, ওয়ারিশ সনদ, জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট গ্রহণ, ব্যবসা-বাণিজ্যের ট্রেড লাইসেন্স ইত্যাদি সেবা প্রদান করে থাকে। কিন্তু গত ৫ই আগস্ট স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা সরকার পতন হওয়ার পর স্থানীয় সরকারের প্রশাসনিক অফিসগুলো প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছিল। কারণ হাসিনা সরকারের পতন হওয়ার পর আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা থেকে শুরু করে তৃণমূল নেতারা পালিয়ে গেছে। অথচ তাদের পালিয়ে যাওয়ার কথা ছিল না। কিন্তু তারা পালিয়েছে। তার কারণ কারও অজানা নয়। আওয়ামী সরকার ক্ষমতায় আসার পর এমন কোন জায়গা নেই যেখানে তারা দলীয়করণ করেনি। স্থানীয় সরকারের সকল পর্যায়ে জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষেত্রে দলীয় নেতা কর্মীদের অবৈধ উপায়ে জিতিয়ে এনেছেন। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বপ্রাপ্ত জনপ্রতিনিধিরা সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে গা-ঢাকা দিয়েছে। এসব এলাকার নাগরিকরা নাগরিক সেবাটুকু পাচ্ছেন না। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হওয়ার পরও ষড়যন্ত্র থামেনি। দেশের ওষুধ শিল্পখাত থেকে শুরু করে পোশাক শিল্প কারখানায় অস্থিরতা চলছে। চারদিকে দাবী আদায়ের মওসুম চলছে। তারপরও দেশটাকে গড়ার সরকার সাধ্যমত চেষ্টা করছে। সারাদেশের স্কুল, কলেজ, বিশ^বিদ্যালয়, অফিস, আদালত ঠিক আগের মতই চলছে। কিন্তু স্থানীয় সরকারের অধীনে পরিচালিত সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদগুলোর অফিস সঠিকভাবে চলছে না।

দেশের বহু জায়গাতে ইউনিয়ন পরিষদ ভবন খোলা আছে কিন্তু নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি পরিষদে যাচ্ছেন না। ফলে নাগিরকরা প্রয়োজনীয় সেবাটুকু পাচ্ছেন না। অথচ এমনটি হওয়ার কথা ছিল না। কিন্তু হচ্ছে। তার কারণ আগে সব ধরনের স্থানীয় সরকার নির্বাচন কিংবা স্কুল ও বাজার কমিটির নির্বাচন নির্দলীয়ভাবে হতো। ২০০৮ সালে আওয়ামী সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০১৪, ২০১৮ সালে পাতানো নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয়ক্ষমতা পাকাপোক্ত করে। উৎসবের ভোটকে তারা নির্বাসনে পাঠায়। তারই ধারাবাহিকতায় ২০১৫ সালে স্থানীয় সরকার নির্বাচন পদ্ধতিকে আইন সংশোধন করে দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের ব্যবস্থা করে। দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হওয়ার পর বাংলাদেশের অধিকাংশ বিরোধী দল স্থানীয় সরকারের নির্বাচন বর্জন করে। ফলে সারাদেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সর্বত্র আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। বিপুল সংখ্যাক আওয়ামী লীগ প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে যারা পেশীশক্তির ব্যবহার করেছিল তারা এখন পালিয়েছে। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পেরিয়ে গেলেও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে উঠেনি। ফলে নিকট অতীতে যারাই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হয়েছেন কম-বেশি সবাই গণতন্ত্রের মোড়কে স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েম করেছিলেন। তবে হাসিনা সরকার সকল ইতিহাসকে ভঙ্গ করেছেন। ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য এমন কোন পন্থা নেই যা তিনি করেননি। হাসিনা সরকারের শাসনামলে তার দলের একটি চক্র নির্ধারণ করত কে মেয়র হবে, কে চেয়ারম্যান কিংবা কাউন্সিলর হবে। অর্থের বিনিময়ে এসব পদ কেনা-বেচা হতো। এমনও দেখা গেছে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয় নেতাকে নমিনেশন না দিয়ে নতুন আরেকজনকে দলের পক্ষ থেকে নমিনেশন দেয়া হয়েছে। ফলে তারা যখন নির্বাচিত হয়ে আসতেন তখনই তারা অবৈধভাবে সে টাকা উঠিয়ে নিতেন। 

২০১৮ সালের পর স্থানীয় সরকারের সকল নির্বাচন বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো বয়কট করেছিল। ফলে হাতে গোনা কিছু ইউনিয়ন ও উপজেলা বাদে বেশিরভাগেই আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা জনপ্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিল। এসব নির্বাচনে যারা জয়ী হয়েছেন তাদের অনেকের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ উঠেছিল। স্থানীয় সরকারের সকল স্তরে আওয়ামী লীগ একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল। জেলা ও উপজেলা পরিষদ থেকে শুরু করে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ আওয়ামী লীগের দখলে ছিল। এখন যারা আত্মগোপনে আছেন তাদের ব্যাপারে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন-আত্মগোপনে থাকা জনপ্রিতিনিধিরা যোগ্য ব্যক্তি ছিলেন না। তিনি জাতীয় এক দৈনিকে বলেন, দলীয় মনোনয়ন যারা পেয়েছিলেন, তাদের অধিকাংশই দুর্বৃত্ত। সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে তারা দায়িত্বে আসেননি। মনোনয়ন-বাণিজ্য, পেশিশক্তি, কালোটাকা ও প্রশাসনিক সহায়তায় তাঁরা নির্বাচনে জিতেছিলেন। তাই জনরোষের ভয়ে এখন পালিয়েছেন। সাবেক স্থানীয় সরকার সচিব আবু আলম শহীদ খান বিবিসি বাংলার এক সাক্ষাৎকারে বলেন-গত বেশ কয়েক বছর ধরে এমন সব নির্বাচন হয়েছে যে নির্বাচন নিয়ে মানুষের মনে অনেক প্রশ্ন রয়েছে। সরকার পরিবর্তনের ফলে মানুষ এখন ক্ষোভ প্রকাশ করছে। তাদের অপসারণ চাইছে। তবে যে সব ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে স্বতন্ত্র বা অন্য রাজনৈতিক দলের নেতারা নির্বাচিত হয়েছেন সে সব জায়গায় চেয়ারম্যানদের খুব একটা সমস্যা হচ্ছে না। তবে যারা পালিয়েছেন তাদের অধিকাংশজনই দুর্নীতিতে নিমজ্জিত ছিলেন। অধিকাংশ এলাকাতে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানরা কর্মস্থলে অনুপস্থিত আছেন। যার ফলে জনসেবাসহ সাধারণ কার্যক্রম বিঘ্নিত হচ্ছে।

একটি গণতান্ত্রিক দেশের স্থানীয় সরকার ছায়া সরকার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। রাষ্ট্রের সর্বনিম্ন স্তরের শাখা হলেও সরকারের গ্রামীণ উন্নয়নে তারা ভূমিকা পালন করেন। বর্তমানে বাংলাদেশে ৮টি বিভাগ, ৬৪টি জেলা, ৪৯৫টি উপজেলা,৩৩০টি পৌরসভা, ১২ টি সিটি করর্পোরেশন এবং ৪৭৭১টি ইউনিয়ন পরিষদ রয়েছে। ছাত্র জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে স্বৈরশাসকের পদত্যাগের পর স্থানীয় সরকারের অধিকাংশ জনপ্রতিনিধি আত্মপোপনে চলে গেছেন। প্রথম আলোর এক প্রতিবেদন মারফত জানা যায় যে, দেশের ৬৪টির মধ্যে ৪৪টি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানই বর্তমানে আত্মগোপনে রয়েছেন। ৪৯৫টি উপজেলা পরিষদের ৩১৯টিতেই উপজেলা চেয়ারম্যানরা গা-ঢাকা দিয়েছেন। আর ৩৩০টির মধ্যে ২০৫টি পৌরসভার মেয়র আত্মগোপনে আছেন। দেশের ১২টি সিটি করপোরেশনের মধ্যে ৯টির মেয়র আত্মগোপন রয়েছেন।

 

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটির ১২৯ কাউন্সিলরের মধ্যে আত্মগোপনে আছেন ১১৮ জন। তবে অনেকে অফিসে আসছে না। তাদের অধীনস্থ কর্মচারীরাও অফিসে অনুপস্থিত। সিটি করপোরেশনের কিছু ওয়ার্ড কাউন্সিলর বরখাস্ত হননি। অথচ তারাও পালিয়েছেন। ফলে জরুরি সেবা বিঘ্নিত হচ্ছে। তবে আশার কথা হচ্ছে নাগরিকদের স্বার্থে অন্তর্বর্তী সরকার অধিকাংশ জায়গায় প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছেন। জেলা ও উপজেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান, মেয়র ও কাউন্সিলর অপসারণ করে প্রশাসক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তবু জনগণ নাগরিক সেবাটুকু পাচ্ছে না। অনেকে স্থানীয় সরকারের অফিসগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও জরুরি কাজটুকু করতে পারছেন না। বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন। এসব প্রতিষ্ঠানে যেসব জনপ্রতিনিধি অনুপস্থিত আছেন তাদের তালিকা করে নতুন কাউকে দায়িত্ব দেয়া যেতে পারে। জরুরি ভিত্তিতে স্থানীয় সরকারের সকল ইউনিটকে কার্যকরী করে তোলা প্রয়োজন, যেন নাগরিক সেবা বিঘ্নিত না হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ